|
অপটিক্যাল ফাইবার একধরনের পাতলা, স্বচ্ছ তন্তু বিশেষ, সাধারনত কাঁচ অথবা প্লাস্টিক দিয়ে বানানো হয়, যা আলো পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। ফাইবার অপটিকস ফলিত বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সেই শাখা যা এই অপটিক্যাল ফাইবার বিষয়ে আলোচনা করে। অপটিক্যাল ফাইবার সাধারনত টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে, এছাড়া আলোকসজ্জা, সেন্সর ও ছবি সম্পাদনার কাজেও বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। াা==অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি== অপটিক্যাল ফাইবার একটি সিলিন্ডার আকৃতির ডাই-ইলেক্ট্রিক আলোক মাধ্যম যা এর অক্ষ বরাবর পূর্ণ আভ্যন্তরীন প্রতিফলন প্রক্রিয়ায় আলো পরিবহন করে। তন্তুটি ঘন কোর (core) ও পরিবেষ্টিত ক্ল্যাডিং (cladding) স্তরে বিভক্ত। পূর্ণ আভ্যন্তরীন প্রক্রিয়ায় আলোক সংকেত পরিবহনের পূর্বশর্ত হচ্ছে কোরের প্রতিসরাঙ্ক ক্ল্যাডিং-এর থেকে বেশি হতে হবে। ক্ল্যাডিং ও কোরের সীমানায় প্রতিসরণাঙ্কের পরিবর্তন খাড়া (abrupt) হতে পারে (স্টেপ-ইনডেক্স ফাইবার (step-index fiber) এর বেলায়), অথবা ঢালু (gradual) হতে পারে (গ্রেডেড-ইনডেক্স ফাইবার (graded-index fiber) এর বেলায়)। বড় ব্যাসের (১০ μm থেকে বড়) তন্তুর ধর্মাবলী আলোক জ্যামিতির সাহায্যে বিশ্লেষন করা যায়। তরিৎচুম্বকীয় বিশ্লেষনে এ ধরনের তন্তুকে বলে মাল্টি-মোড ফাইবার (multi-mode fiber)। স্টেপ-ইনডেক্স ফাইবারে আলোক রশ্মি তন্তুর কোর দিয়ে পূর্ণ আভ্যান্তরীন প্রতিফলনের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। যে সমস্ত রশ্মি কোর-ক্ল্যাডিং সীমানায় সঙ্কট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত হয় সেগুলো পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়। সঙ্কট কোণ, কোর ও ক্ল্যাডিং এর উপাদানের প্রতিসরাঙ্কের পার্থক্যের উপর নির্ভর করে। যে সমস্ত রশ্মি অল্প কোণে আপতিত হয় সেগুলো ক্ল্যাডিং এ প্রতিসরিত হয় যা কোরে আলোক প্রবাহের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে যায়। এইভাবে পূর্ণ আভ্যান্তরীন প্রতিফলনের জন্য সর্বনিন্ম কোণ তন্তুর অ্যাকসেপ্টেন্স অ্যাঙ্গেল (acceptance angle) নির্ধারণ করে যা সাধারনভাবে নিউমেরিক্যাল অ্যাপারচার নামে পরিচিত। উচ্চ নিউমেরিক্যাল অ্যাপারচারের কোন তন্তু ব্যবহার করলে ট্রান্সমিটার বা প্রচারযন্ত্র এবং রিসিভার বা গ্রাহকযন্ত্র সহজে তন্তু দিয়ে আলোক সংকেত পরিবহন করতে পারে। কিন্তু কোরের কাছে বিভিন্ন কোণে আলোক রশ্মি প্রবাহিত হলে, উচ্চ নিমেরিক্যাল অ্যাপারচারের কোন তন্তুর বহু-পথে ছড়ানো (multi-path spreading), বা বিচ্যুতি (dispersion), ঘটে। গ্রেডেড-ইনডেক্স ফাইবারের ক্ষেত্রে কোরের প্রতিসরাঙ্ক অক্ষ থেকে ক্ল্যাডিং এর দিকে ক্রমশ কমতে থাকে। এর ফলে আলো যখন ক্ল্যাডিং এর দিকে যায় তখন সরাসরি কোর-ক্ল্যাডিং তলে প্রতিফলিত না হয়ে সূক্ষ্মভাবে বেঁকে যেতে থাকে। এর ফলে বৃত্তচাপের মত আলোক পথ তৈরী হয় যার ফলে বহু পথে ছড়ানোর সমস্যা হ্রাস পায়। প্রতিসরাঙ্কের পরিবর্তন এমনভাবে করা হয় যাতে বিভিন্ন কোনে প্রবাহিত আলোকরশ্মির গতি প্রায় সমান হয়। আদর্শ প্রতিসরাঙ্কের পরিবর্তন অক্ষ থেকে দুরত্ব ও প্রতিসরাঙ্ক এর মধ্যকার অধিবৃত্তীয় সমীকরণের প্রায় কাছাকাছি। যেসব তন্তুর ব্যাস খুব কম (আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সামান্য ছোট) সে রকম তন্তুতে কেবল একটি আলোক রশ্মি প্রবাহিত করা যায়। এ ধরনের অপটিক্যাল ফাইবারকে বলে সিঙ্গেল-মোড অপটিক্যাল ফাইবার (Single-mode optical fiber) অথবা মনো-মোড ফাইবার। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিশ্লেষন থেকে দেখা যায় পরিবাহিত আলোক শক্তি সম্পূর্ণভাবে কোরে বিরাজ করে না, ক্যাডিং এও শক্তির (বিশেষকরে মনো-মোড এর বেলায়) উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবাহিত হয়। সাধারন সিঙ্গেল-মোড ফাইবারের কোরের ব্যাস হয় ৮ থেকে ১০ মাইক্রোমিটার। মোডের গঠন আবার ব্যবহৃত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করে। মাল্টি-মোড ফাইবারের কোরের ব্যাস হয়ে থাকে ৫০µm, ৬২.৫ µm, অথবা আরো বেশি। বিশেষ প্রয়োজনে অপটিক্যাল ফাইবারের কোরের গঠন গোলাকার না হয়ে উপবৃত্তাকার অথবা চতুস্কোনীয় হতে পারে। এর মধ্যে পড়ে পোলারাইজেশন-মেইনটেইনিং অপটিক্যাল ফাইবার (polarization-maintaining optical fiber) ও হুইস্পারিং গ্যালারি মোড (whispering gallery mode) দূর করার জন্য বিশেষ ফাইবার। ২ মেগাওয়াট/বর্গ সেন্টিমিটার এর অধিক আলোক তীব্রতায় কোন অপটিক্যাল ফাইবার শক বা অন্য কারনে জ্বলে গেলে ফাইবার ফিউজ (fiber fuse) ঘটে। তখন ভাঙ্গার পূর্বেই ফাইবারটি বাস্পীভূত হয়ে যায় এবং প্রবাহ বন্ধ না হয়ে ১-৩ মিটার/সেকেন্ড বেগে প্রবাহিত হতে থাকে [১],[২],[৩]।
উপাদানকাঁচের অপটিক্যাল ফাইবার সাধারনত সবসময় বালি (silica) থেকে তৈরী করা হয়। স্বল্প-তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত (infrared) আলোর জন্য কখনও কখনও ফ্লুরোজিরকোনাইট (fluorozirconate), ফ্লুরোঅ্যালুমিনেট (fluoroaluminate), এবং ক্যালকোজেনাইড (chalcogenide) কাঁচ ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য কাঁচের মত এদের প্রতিসরণাঙ্ক প্রায় ১.৫। সাধারনত কোর ও ক্ল্যাডিং এর মধ্যে প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্য হয় ১%। প্লাস্টিক অপটিক্যাল ফাইবার (Plastic optical fiber) (POF) সাধারনত স্টেপ-ইনডেক্স মাল্টিমোড ফাইবারে ব্যবহৃত হয় যার কোরের ব্যাস ১ মিমি অথবা বেশি। POF এর এটেনিউয়েশন (attenuation) সাধারনত বেশি হয় (অর্থাৎ এটিতে আলোক সংকেতের শক্তি দ্রুততর কমতে থাকে), ১ ডেসিবল/মিটার বা বেশি, এবং এই উচ্চ হারের কারনে POF এর কাজের পরিধি সীমিত। ইলেক্ট্রনিক প্রতিবন্ধকতাঅপটিক্যাল ফাইবার প্রতিসেকেন্ডে ২৫ টেরাবিট তথ্য আদান প্রদানে সক্ষম, কিন্তু ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকৃত তথ্য সংকেত ( signal ) প্রতিসেকেন্ডে ১-১০ গিগাবিটের বেশি তথ্য তৈরি করতে পারে না।তাই অপটিক্যাল ফাইবার তার পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না। এ সমস্যা দূর করতে হলে আলোকীয় সংকেত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে হবে। ধারণা করা হয়ে থাকে, যদি সকল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অপটিক্যাল হয়ে থাকে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাদার্স ডে উপলক্ষে একদিনে যত টেলিফোন কল করা হয়ে থাকে, তার সবই একযোগে একটি মাত্র অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে পাঠানো সম্ভব। অপটিক্যাল ফাইবার যোগাযোগব্যবস্থাঅপটিক্যাল ফাইবার টেলিযোগাযোগ বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে কারন এটিকে সহজে বাকানো যায় ও সাধারন তারের মত ব্যবহার করা যায়।যদিও অপটিক্যাল ফাইবার স্বচ্ছ কাঁচ বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরী হতে পারে তবে দূরবর্তী যোগাযোগের জন্য সবসময় কাঁচের অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হয়, কারন এতে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরন কম হয়। মাল্টি-মোড ও সিঙ্গল-মোড দুই ধরনের তন্তুই ব্যবহৃত হয়। তবে মাল্টি-মোড স্বল্প দূরত্বের (৫০০ মিটার) জন্য ও সিঙ্গল-মোড দীর্ঘ দূরত্বের লিঙ্ক (links) এর জন্য উপযোগী। যেহেতু সিঙ্গল-মোডে সূক্ষ্ম পরিমাপের প্রয়োজন বেশি সেহেতু সিঙ্গল-মোড ট্রান্সমিটার, রিসিভার, অ্যাম্পলিফায়ার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দাম সাধারনত বেশি। সাধারনত অবলোহিত রশ্মি অপটিক্যাল ফাইবার যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়। তন্তুর শোষন (fiber absorption) ১৫৫০ ন্যানোমিটার আলোর জন্য সবচেয়ে কম এবং বিচ্যুতি (dispersion)১৩১০ ন্যানোমিটারে সবচেয়ে কম, ফলে এগুলোই তথ্য পরিবহনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ৮৫০ ন্যানোমিটারে একটি লোকাল মিনিমাম পাওয়া যায়, যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য কম খরচে ট্রান্সমিটার ও রিসিভার বানানো যায়। ফলে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায়শ স্বল্প দূরত্বের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অপটিক্যাল ফাইবার সাধারনত জোড়ায় জোড়ায় ব্যবহৃত হয়, যার প্রতিটি বিপরীত দিকে তথ্য আদান প্রদানে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু কাঁচের প্রতিসরণাঙ্ক প্রায় ১.৫, ফাইবারে আলোর গতিবেগ প্রায় ২০০,০০০ কিমি/সেকেন্ড, বা শূণ্যে আলোর গতির দুই তৃতীয়াংশ। আধুনিক কাঁচের অপটিক্যাল ফাইবারের বেলায় সর্বোচ্চ দূরত্ব আলোর বিচ্যুতির (dispersion) কারনে সীমাবদ্ধ। অপটিক্যাল ফাইবারের এই বিচ্যুতি (Dispersion) বিভিন্ন কারনে হতে পারে। তড়িৎ পরিবহনের সাথে তুলনাযোগাযোগব্যবস্থায় অপটিক্যাল ফাইবার নাকি ইলেকট্রিক্যাল (বা তামা) তার কোনটি ব্যবহার করা হবে তা কিছু ছাড় এর উপর নির্ভর করে। যেসব ক্ষেত্রে উচ্চ ব্যান্ডউইডথ দরকার বা অধিক দূরত্বে তথ্য প্রেরণ করতে হলে সাধারনত অপটিক্যাল ফাইবার পছন্দনীয়। এর প্রধান সুবিধা হচ্ছে এতে তথ্যের ক্ষতি খুব কম হয়, ফলে অধিক দূরত্বে অ্যাম্পলিফায়ার বা রিপিটার ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। এবং এর ডাটা-পরিবহন ক্ষমতা এতই বেশি যে এই ক্ষমতা পেতে হাজার হাজার ইলেকট্রিক্যাল লিঙ্ক লাগবে কেবল একটি অপটিক্যাল ফাইবারকে প্রতিস্থাপন করতে। ফাইবার তামার তুলনায় অনেক হালকা: ৭০০ কিমি টেলিযোগাযোগ তামার কেবলের ওজন ২০ টন। এই একই কেবল যদি ফাইবার দিয়ে বানানো হয় তাহলে লাগে কেবল ৭ কেজি কাঁচ[৪]। আরও সুবিধা হচ্ছে একাধিক ফাইবার পাশাপাশি অনেক দুরত্ব অতিক্রম করলেও ক্রসটক হয় না যা কিনা কোন কোন ইলেকট্রিক কেবলের একটি সমস্যা।
তড়িৎ যোগাযোগের এই সুবিধার কারনে সাধারনত স্বল্প দুরত্বের ব্যবস্থায় অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হয় না, তবে গবেষণাগারে এসব প্রযুক্তি তৈরী করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে স্বল্প দূরত্বে অথবা কম ব্যান্ডউইডথরে কোন ব্যবস্থায়ও অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হতে পারে, কারনঃ
সরকারী মানঅনেক প্রস্তুতকারক অপটিক্যাল ফাইবার তৈরী করে থাকে। এদের ফাইবারগুলো যাতে যেকোন ব্যবস্থায় ঠিকমত কাজ করতে পারে এজন্য কিছু মান তৈরী করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন ফাইবার সম্পর্কিত কতগুলো মান প্রকাশ করেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ
বিভিন্ন সংস্থা থেকে অন্যান্য মান প্রকাশিত হয়েছে, যা ফাইবারের বিভিন্ন কর্মদক্ষতা নির্দেশ করে। কয়েকটি মান হলঃ ফাইবার অপটিক সেন্সরটান, তাপমাত্রা, চাপ ও আরো অনেক উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যম (Sensor) হিসেবে অপ্টিক্যাল ফাইবারকে ব্যবহার করা যায়। ছোট আকৃতি এবং কম বিদ্যুৎ খরচের কারনে তড়িৎ সেন্সরের থেকে অপটিক্যাল ফাইবারের সুবিধা বেশি। সেসিমিক সোনারের হাইড্রোফোন হিসেবে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। ১০০ এর বেশি সেন্সর নিয়ে হাইড্রোফোন সিস্টেম তৈরি হয়েছে। তেল শিল্পে হাইড্রোফোন সেন্সর সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে লেজার মাইক্রোফোনও তৈরি করেছে। তেলকুপের তাপমাত্রা ও চাপের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার সেন্সর তৈরি হয়েছে। এসব কাজের জন্য ফাইবার অপটিক উপযুক্ত কারন অর্ধ-পরিবাহী সেন্সরগুলি এই তাপমাত্রা ও চাপ সহ্য করতে পারে না। বোয়িং ৭৬৭ এর অপটিক্যাল গাইরোস্কোপ সেন্সর হিসেবেও অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। কোন কোন গাড়ীতেও আজকাল অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। অপটিক্যাল ফাইবারের অন্যান্য ব্যবহারগঠনঅপটিক্যাল ফাইবার কেবলসশেষ সংযোগস্থান ও বিভক্তি (Termination and splicing)ইতিহাসটুকিটাকি
তথ্যসূত্র
বহিঃসংযোগ
|
This article is from Wikipedia. All text is available under the terms of the GNU Free Documentation License.
Mercedes Car
This site monitored by SitePinger.net